গ্যাস–সংকটে নাকাল নগরবাসীর একাংশ

গ্যাস–সংকটে নাকাল নগরবাসীর একাংশ

কোথাও সকাল সাতটার পর থেকে চুলা জ্বলে না। সন্ধ্যায় গ্যাসের চাপ খানিকটা বাড়লে দুই কাপ চায়ের পানি গরম হতেই লেগে যায় এক ঘণ্টা। তাই রান্নার জন্য অপেক্ষার প্রহর বাড়তে থাকে, যা শেষ হয় রাত ১০টার পর। আবার কোথাও সারা দিনই টিমটিম করে চুলা জ্বলে। কিন্তু তা রান্না করার জন্য যথেষ্ট নয়।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের যে সংকট চলছে, এটা তার একটি খণ্ডচিত্র। গত কয়েক বছরে শীতের মৌসুমে ঘুরেফিরে আসা এই সংকট একটি স্থায়ী রূপ পেয়ে গেছে। আর বরাবরের মতোই এই সংকট উত্তরণে কোনো আশার কথা শোনাতে পারছে না ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা তিতাস গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড।

আবাসিক খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের এই সংকটের বিষয়ে গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে তিনটা থেকে পরবর্তী দুই ঘণ্টা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অন্তত ২০ জন গ্রাহকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের এলাকায় গ্যাস একেবারেই না থাকা কিংবা থাকলেও তা কাজে না আসার কথা বলেছেন। এ অবস্থায় বিকল্প হিসেবে তাঁদের কেউ বেছে নিয়েছেন এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার কিংবা কেরোসিনের স্টোভ অথবা মাটির চুলা। আবার কেউ কেউ পরিস্থিতি অনুসারে হোটেল থেকে খাবার আনিয়ে দিন পার করছেন।

এসব গ্রাহকের দেওয়া তথ্য অনুসারে, এই মুহূর্তে ঢাকার যেসব জায়গায় গ্যাস-সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে, সেই এলাকাগুলো হচ্ছে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার ও কাজী আলাউদ্দিন রোড, যাত্রাবাড়ীর ধলপুর, কাজলা ও বিবির বাগিচা এলাকা, কামরাঙ্গীরচরের মুন্সিহাটি, জুরাইন, পোস্তগোলা, সিপাহীবাগ, মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোড এবং মিরপুরের একাংশ।

এর মধ্যে মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের গ্যাস-সংকটের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ফারজানা বলেন, দেড় মাস ধরে বাসায় সকালের নাশতা তৈরি হয় না। সারা দিনে চুলা জ্বলে না। কেবল রাতের খাবারটা বাড়িতে তৈরি করা হয়।

সিপাহীবাগ এলাকার বাসিন্দা নীলু মমতাজের ভাষ্যও একই রকম। তিনি বলেন, ‘চাকরিজীবী ছেলেকে সকালের নাশতা দিতে পারি না। দুই কাপ চায়ের পানি গরম হতেই ঘণ্টাখানেক লেগে যায়।’

কামরাঙ্গীরচরের মুন্সিহাটি এলাকার মোহাম্মদ মাইনুদ্দীন জানান, তাঁর এলাকায় রাত ১০টার পর গ্যাসের যে চাপ আসে তা রান্না করার উপযোগী থাকে না। তাই দুই সপ্তাহ ধরে তাঁদের বাড়িতে এক হাঁড়ি ভাত পর্যন্ত রান্না হয়নি।

এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে সম্প্রতি একটি এলপি গ্যাস সিলিন্ডার কেনার কথা জানান মিরপুরের ঝিলপাড় এলাকার বাসিন্দা অনন্যা মাহবুব। আর কেরোসিনের স্টোভ কিনে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন তাঁতীবাজারের রুখসানা পারভীন।

জুরাইন মিষ্টির দোকান এলাকার মো. সোলায়মান বলেন, আগে এই এলাকায় গ্যাসের তেমন কোনো সংকট না থাকলেও তিন দিন ধরে সমস্যা শুরু হয়েছে। এই মুহূর্তে গ্যাসের চাপ একেবারেই নেই।

এ বিষয়ে কথা হয় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক (অপারেশনস) এইচ এম আলী আশরাফের সঙ্গে। উল্লিখিত এলাকাগুলোতে গ্যাস-সংকটের এমন চিত্রের বিষয়ে তাঁর অভিমত, ‘গ্যাসের চাহিদা ও জোগানের যে ফারাক, তাতে এমন সমস্যা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। এমনিতে আমাদের দৈনিক ঘাটতির পরিমাণ ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর সঙ্গে যখন তাপমাত্রা কমে যায়, শৈত্যপ্রবাহ চলে, তখন গ্যাসের ব্যবহার আরও বেড়ে যায়। ফলে সংকটও বাড়ে।’

সংকট সমাধানের বিষয়ে তিতাস গ্যাসের কোনো উদ্যোগ আছে কি না—জানতে চাইলে আলী আশরাফ বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। কোনো কোনো এলাকায় লাইন বাইপাস করে সমস্যা সমাধান করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দ্রুত বর্ধনশীল এলাকাগুলোতে এটা সম্ভব হয়ে ওঠে না।’

তিতাসের জরুরি নিয়ন্ত্রণ বিভাগের আরেক কর্মকর্তার ভাষ্য, সরবরাহের ঘাটতির পাশাপাশি গ্যাস–সংযোগের নেটওয়ার্ক আপগ্রেড না হওয়াও সংকটের আরেকটি কারণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*