টেস্টে আসলেই আগ্রহ নেই তরুণ ক্রিকেটারদের!

টেস্টে আসলেই আগ্রহ নেই তরুণ ক্রিকেটারদের!

দুদিন আগে সিডনিতে মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) বার্ষিক সভায় অংশ নিয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। সভায় বাংলাদেশ টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়কের দেওয়া বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমকে রিকি পন্টিং যা জানিয়েছেন, সেটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য অশনিসংকেত।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক জানিয়েছেন, সভায় সাকিব তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের কঠিন এক বাস্তবতা। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সভায় বলেছেন, টি-টোয়েন্টি থেকে বেশি আয়ের সুযোগ থাকায় বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ ক্রিকেটার টেস্ট ক্রিকেটকে আর তাঁদের লক্ষ্য হিসেবে দেখেন না। এমসিসির সভায় অংশগ্রহণকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ২০ ওভারের ক্রিকেট তরুণদের কাছে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে শুধু টেস্ট নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গুরুত্ব অনেক দেশের খেলোয়াড়দের কাছে কমে যাবে।

আসলেই কি বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটাররা টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি তেমন আকর্ষণ বোধ করেন না? প্রশ্নটার উত্তর খুঁজেছে প্রথম আলো। ত্রিদেশীয় সিরিজ ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজ সামনে রেখে গত মাসে ৩২ জনের যে প্রাথমিক দল দিয়েছিল বিসিবি, সেখানে থাকা ৯ তরুণ খেলোয়াড়ের কাছে প্রথম আলো প্রশ্ন করেছিল, ক্রিকেটের কোন সংস্করণে তাঁদের বেশি আগ্রহ বা কোন সংস্করণে খেলতে বেশি ভালো লাগে? উত্তরে টি-টোয়েন্টির কথা না বললেও টেস্টের প্রতিও খুব বেশি খেলোয়াড় আগ্রহ প্রকাশ করেননি। সংগত কারণে এই ক্রিকেটারদের কারও নাম প্রথম আলো প্রকাশ করছে না।

৯ তরুণ খেলোয়াড়ের মাত্র একজন বলেছেন টেস্টের প্রতিই তাঁর বেশি আগ্রহ, ‘টেস্ট হচ্ছে টোটাল ক্রিকেট। এটার মধ্যে টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সবই আছে। ক্রিকেটের পূর্ণ স্বাদ পাওয়া যায় একমাত্র টেস্টেই।’ আরেকজন জানিয়েছেন, ক্রিকেটের তিন সংস্করণই তাঁর সমান প্রিয়। বাকি সাতজনই বলেছেন, ওয়ানডের প্রতি তাঁদের বেশি আগ্রহ। তবে একজনের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দুটিই ভালো লাগে। তাঁর যুক্তি, ‘আমাদের টেস্ট দলটা সেভাবে উন্নতি করেনি। কিন্তু ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলটা বিশ্বমানের। আমাদের মতো তরুণ খেলোয়াড়েরা তাই এ দুই সংস্করণের প্রতি বেশি আগ্রহী।’

ওয়ানডে কেন প্রিয়, সেটির ব্যাখ্যায় এক পেসার বলেছেন, ‘শেখার জন্য বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটের বিকল্প নেই। তবে বেশি মজা লাগে ওয়ানডে খেলতে। ওয়ানডেতে আপনি সব পাবেন। নতুন বল, পুরোনো বল, ইনিংসের মাঝে কিংবা স্লগ-ডেথ ওভারে কীভাবে বোলিং করবেন, সবই জানা-বোঝা যায় ওয়ানডেতে। আবার ম্যাচের ফলও পাওয়া যায়। টি-টোয়েন্টিতে শেখার কিছু নেই।’ আরেক তরুণ ব্যাটসম্যান বললেন, ‘টেস্ট হচ্ছে মর্যাদার খেলা। তবে বেশি মজা পাই ওয়ানডেতে।’

এখনো বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটারদের পছন্দের তালিকায় টি-টোয়েন্টি এক নম্বরে না থাকার বড় কারণ হতে পারে খুব বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার সুযোগ না পাওয়া। বিপিএলের বাইরে অন্য দেশের লিগগুলোতে বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটাররা তেমন সুযোগ পান না। ওয়ানডের প্রতি সবার বেশি আগ্রহের পেছনে এক পেসারের যুক্তি, ‘ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ, তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট ৫০ ওভারের হয়। জেলা-বিভাগীয় পর্যায়েও ৫০ ওভারের ক্রিকেট বেশি হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি খেলে ওয়ানডে। এই সংস্করণে আমাদের সাফল্যও বেশি। একজন তরুণ খেলোয়াড় এই সংস্করণে বেশি ভালো করতে চায়। যেটিতে সফল হওয়ার সুযোগ বেশি, সেটির প্রতি বেশি আগ্রহ থাকবে।’

টি-টোয়েন্টির প্রতি কম আগ্রহ বা ওয়ানডের প্রতি বেশি আগ্রহ—যেটিই হোক, একটি বিষয় পরিষ্কার, বেশির ভাগ তরুণ খেলোয়াড়ের পছন্দের তালিকার এক নম্বরে নেই বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থিক কারণেই বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটে আগ্রহ কম। বাংলাদেশ দলের সাবেক এক অধিনায়ক বললেন, ‘আমাদের ক্রিকেটারদের সীমিত ওভারের ক্রিকেটের প্রতি ঝোঁক বেশি। কিন্তু বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটে ভালো না করতে পারলে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ভালো করা যায় না। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে অল্প পরিশ্রমে বেশি টাকা। বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটে পারিশ্রমিক না বাড়ালে এ সংস্করণে আগ্রহ কমে যাবে তরুণ ক্রিকেটারদের। যদিও আমরা বিনে পয়সায় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছি। কিন্তু ফ্র্যাঞ্চাইজির লিগের এই যুগে কম পারিশ্রমিক দিলে স্বাভাবিকভাবেই খেলোয়াড়দের আগ্রহে ভাটা পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*